অপরাধ সময় ঃ- নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে কাজ বণ্টনকে ঘিরে অনিয়ম, সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি, উন্নয়ন কার্যক্রমের পরিবর্তে এই ইউনিটে গড়ে উঠেছে একটি নিয়ন্ত্রিত ‘কাজ বাণিজ্যের’ সংস্কৃতি, যেখানে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার চেয়ে প্রভাব, কমিশন ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্যই প্রধান হয়ে উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইউনিটটির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের ভাষ্য, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি নাকি অগ্রিম কমিশনভিত্তিক কাজ বণ্টনের একটি অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি চালু করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের এস্টিমেট আগেই নির্বাচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যায় এবং কাজ পাওয়ার জন্য ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছে। লাইসেন্সধারী অনেক ঠিকাদার অগ্রিম অর্থ প্রদান করেও কাজ পাচ্ছেন না। আবার যারা কাজ পাচ্ছেন, তাদের নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল সংগ্রহ করতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে চুক্তি বাতিলের মৌখিক হুমকির কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন ঠিকাদার। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দপ্তরে মানসম্মত সরবরাহকারী পুরোনো ঠিকাদারদের অনেকে কার্যত কাজের বাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন বলে দাবি তাদের।
এদিকে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে সম্পাদিত কাজের মান নিয়েও সমালোচনা উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত আচরণসংক্রান্ত নানা অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। অতীতে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে পরবর্তীতে অল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রত্যাবর্তন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে একটি প্রতিষ্ঠানের অস্বাভাবিক উত্থান নিয়েও আলোচনা সামনে এসেছে। “ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড” নামের প্রতিষ্ঠানটি গত দুই অর্থবছরে মডেল মসজিদসহ একাধিক প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের কাজ পেয়েছে বলে নথিতে দেখা যায়। এর মধ্যে ২০২৫/১৩ নং লটে ৩,৫৩,৪৫,৮০২ টাকা, ২০২৫/৩ ও ২০২৫/৪ নং লটে ৩,৩৭,৩৭,৯০২ টাকা করে কাজ পাওয়ার তথ্য রয়েছে। এছাড়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে প্রায় ২৭ লাখ টাকা, শহীদ নায়েব সুবেদার আশরাফ আলী খান বীরবিক্রম লাইব্রেরিতে প্রায় ১.৮২ কোটি টাকা এবং পাবলিক লাইব্রেরি বহুমুখী ভবনে প্রায় ১.৯৩ কোটি টাকার কাজ পাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, ভবনের মূল নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই কীভাবে ফার্নিচার সরবরাহের চুক্তি সম্পাদিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আরও কয়েকটি ফার্নিচার কোম্পানির নামও বিভিন্ন মহলে আলোচনায় এসেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও শুরুতে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন এবং অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য এড়িয়ে যান।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত তথ্য ভুক্তভোগী ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রাপ্ত নথির ভিত্তিতে উপস্থাপিত অভিযোগ। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ এবং স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।