স্টাফ রিপোর্টার: সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের নানা স্তরে সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর (সওজ) যেন তার বাইরে রয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, সদ্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা বহুল আলোচিত সিন্ডিকেট—যা পরিচিত ‘কাদের চক্র’ নামে—এখনও সড়ক ভবনে কার্যকর রয়েছে। বরং সংস্কারের নামে আওয়ামীপন্থী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া আরও সুসংগঠিতভাবে এগোচ্ছে।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর অনেক মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে বদলি ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ দেখা গেলেও সওজে তার উল্টো চিত্র। বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পূর্বের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনরায় বসানো হচ্ছে। সর্বশেষ বদলিতে এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়েছে। তাকে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি ঘরানার বলা হলেও বাস্তবে গত এক যুগে আওয়ামী সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবেই তিনি পরিচিত। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই তিনি বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সওজের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে ‘কাদের চক্র’ সড়ক উন্নয়ন খাতে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটে রূপ নেয়। এই চক্র বদলি বাণিজ্য, প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ ও অর্থপাচারের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকে জিম্মি করে রাখে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ ও অনিয়ম ছিল নিয়মিত ঘটনা।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর এই চক্রের অংশ হিসেবে অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যগামী এসব সফরের আড়ালে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিবারের বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে।
সরকার পরিবর্তনের পর সওজে মৌলিক সংস্কারের প্রত্যাশা থাকলেও বিভাগটির শীর্ষ পদে এখনও বহাল রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে পরিচিত। সওজের একাধিক সূত্র অভিযোগ করেছে, তার নেতৃত্বেই এখন কৃত্রিম ‘ঠিকাদার সংকট’ তৈরি করে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য জনভোগান্তি বাড়িয়ে সরকারের প্রতি অসন্তোষ উসকে দেওয়া।
মঈনুল হাসান বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য এবং আইইবি নির্বাচনে আওয়ামী-ঘনিষ্ঠ প্যানেল থেকে নির্বাচিত কাউন্সিল মেম্বার ছিলেন। সরকারি দায়িত্বে থেকেও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং মুজিব মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণের ঘটনায় তিনি আগেও সমালোচিত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই আজাদ রহমান ‘কাদের চক্র’-এর গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন।
২০০৭–০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে এ.কে.এম আজাদ রহমান ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হলেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরে আবার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কর্মকর্তারাই প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছেন।
বর্তমানে বদলি, বিদেশ সফর ও টেন্ডার অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এখনও পুরনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে বলে অভিযোগ। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে প্রকল্প বিলম্ব ও রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সওজে গড়ে ওঠা এই গভীর প্রশাসনিক বলয় ভাঙা না গেলে কোনো সংস্কারই কার্যকর হবে না। এক সাবেক সচিবের ভাষায়, “আজাদ ও মঈনুলদের মতো কর্মকর্তারা বহাল থাকলে রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”