রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে সন্ত্রাসের রাজত্ব ফারুকের, গ্রেপ্তারের পরেই হারালেন দলীয় পদ

 

জয় ই মামুন বিশেষ প্রতিবেদকঃ

ঢাকার সীমানাঘেঁষা মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আটিগ্রাম ইউনিয়ন– একসময়ের শান্ত জনপদ এখন আতঙ্কের আরেক নাম। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সেখানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে ফারুক হোসেন দেওয়ান ও তার অনুসারীরা। ৫ ই আগষ্টের পর আওয়ামীলীগের খোলস থেকে বের হয়ে জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে প্রকাশ্যে কৃষি জমি ও কৃষক বাঁচা ও আন্দোলন কমিটির সদস্য উপর হামলা করেন ঐ সময় কৃষি জমি ও কৃষক বাঁচা ও আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব জয় ই মামুন সহ গুরুত্বর আহত হন আরো ১০ জন। দলীয় পদের প্রভাব বিস্তার করে সবকিছুই ধামাচাপা চলে তার ইশারায়। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, ভয়ে মুখ খুলতেও সাহস পান না সাধারণ মানুষ।

অভিযুক্ত ফারুক হোসেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী।ও টর্চার সেল।
প্রায় তিন মাস আগে জমি সংক্রান্ত বিরোধে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন ফারুক দেওয়ান। অভিযোগ রয়েছে, একটি পক্ষের হয়ে জমির দখল নিতে নাসির উদ্দিনের পরিবারের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় তার বাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও থামেনি হামলা। বরং পুলিশের সামনেই চলে মারধর ও তাণ্ডব। অভিযোগ আছে, পুলিশ বাধা দিতে গেলে ফারুকের অনুসারীরা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। পরে এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে।

হামলায় আহত নাসির উদ্দিনের পরিবার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে সেখানেও তাদের রেহাই মেলেনি। হাসপাতালে পুনরায় মারধরের শিকার হন ষাটোর্ধ্ব নাসির উদ্দিন। পরে পুলিশ ফারুকের দুই অনুসারীসহ নাসির উদ্দিনকে থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, রাতের আঁধারে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের লোকজনকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেন ফারুক। একইসঙ্গে উল্টো আহত নাসির উদ্দিনকেই বিরোধীপক্ষের মামলায় গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায়ও জরুরি চিকিৎসা না পেয়েই তাকে কারাগারে যেতে হয়।

১৬ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান নাসির উদ্দিন। তবে এতদিনেও নিরাপত্তা মেলেনি তাদের। ফারুক বাহিনীর ভয়ে পরিবার নিয়ে আত্মগোপনে থাকতে হয় তাকে।

ঘটনার প্রায় তিন মাস পর গত ২০ মে, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নিজ বাড়িতে ফেরেন নাসির উদ্দিন। কিন্তু খবর পেয়েই বিকেলে ফের হামলা চালায় ফারুক বাহিনী। ধারালো অস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলায় রক্তাক্ত করা হয় পুরো পরিবারকে। গুরুতর আহত হন নাসির উদ্দিন (৬২), তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম (৫০), ছেলে মেহেদী হাসান (৩০), মুকুল হাসান (২৫), মেয়ে নাসরিন আক্তার (৩২) ও তিশা আক্তার (১৮)।

আহতদের মধ্যে নাসির উদ্দিন ও তার ছেলে মেহেদীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রক্তাক্ত এই হামলার ঘটনা জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনায় নাসির উদ্দিনের ছেলে মুকুল হাসান বাদী হয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার প্রধান আসামি ফারুক দেওয়ানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে তার অনুসারী আরও কয়েকজন আসামি এখনো পলাতক রয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আ.ফ.ম. নূরতাজ আলম বাহার বলেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপকর্ম করলে তার দায় দল নেবে না। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এটাই প্রথম নয়। গত বছরের ৩১ আগস্ট মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ফল ব্যবসায়ী রিয়াজউদ্দিনকে প্রকাশ্যে দোকানের ভেতরে মারধরের অভিযোগও রয়েছে ফারুক দেওয়ানের বিরুদ্ধে। দোকান মালিক সমিতি মামলা করতে চাইলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে আতঙ্ক ও অপমানে দীর্ঘদিন দোকানে যেতে পারেননি ওই বৃদ্ধ ব্যবসায়ী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় চিহ্নিত মাদক কারবারিদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা তোলে ফারুকের বাহিনী। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই তার ওপর নেমে আসে নির্যাতন। কখনো মারধর, কখনো পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি- এভাবেই ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে এলাকায়।

দীর্ঘদিনের ভয় আর নিপীড়নের পর অবশেষে ফারুক দেওয়ানের গ্রেপ্তার এবং দল থেকে বহিষ্কারে স্বস্তি ফিরেছে এলাকাবাসীর মাঝে। তবে তাদের দাবি, শুধু গ্রেপ্তার নয়– সন্ত্রাস, দখলবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *